প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে মায়ের জীবনসংগ্রাম
জন্ম থেকেই শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করছে সুমন। নিজের চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজের জন্য সম্পূর্ণভাবে মায়ের ওপর নির্ভরশীল। স্বামীহারা জরিনা বেগম আজও হুইলচেয়ারে ছেলেকে
ঢাকার উত্তর বাড্ডায় বসবাস করেন জরিনা বেগম। তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুর। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ তিনি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তাঁর একমাত্র ছেলে সুমন, জন্ম থেকেই শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে বেড়ে উঠছে। সে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে বা একা চলাফেরা করতে পারে না। সারাক্ষণ হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজের হাতে ঠিকমতো খেতেও পারে না এবং দৈনন্দিন অনেক কাজের জন্য মায়ের সাহায্য প্রয়োজন।
সুমনের কথা বলার ক্ষমতাও খুব সীমিত। তার কথা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়, তবে মা জরিনা বেগম ছেলের প্রতিটি কথা বোঝার চেষ্টা করেন এবং তিনিই মূলত তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
একদিন জরিনা বেগমকে জিজ্ঞেস করলাম,
সুমন কি জন্ম থেকেই এমন?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
হ্যাঁ বাবা। আমি আল্লাহর কাছে একটি ছেলে সন্তান চেয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে ছেলে দিয়েছেন, তবে হয়তো এটা আমার জন্য একটি পরীক্ষা। আমার সন্তানকে আমি কখনো বোঝা মনে করিনি। যত কষ্টই হোক, তাকে নিয়েই বেঁচে আছি।
তিনি জানান, সুমনের প্রতিবন্ধকতার কারণে তার বাবা একসময় তাদের ছেড়ে চলে যান। তখন সামনে ছিল এক মেয়ে ও প্রতিবন্ধী ছেলে—সংসারে আয়ের মতো কেউ ছিল না। বাধ্য হয়ে তিনি সুমনকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য চাইতে শুরু করেন। মানুষের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ ও খাবার দিয়েই কোনোভাবে মা-ছেলের জীবন চলে।
সময়ের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও সুমনের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাননি জরিনা বেগম। আজও ছেলেকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে উত্তর বাড্ডার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান এবং মানুষের কাছে সহযোগিতা চান।
সুমন একা খেতে পারে না, চলাফেরা করতে পারে না, এমনকি নিজের প্রয়োজনও স্পষ্টভাবে জানাতে পারে না। তাই প্রতিদিনের জীবনে মায়ের ওপরই তার সম্পূর্ণ নির্ভরতা।
তবে একজন মায়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা শুধু আজকের দিনটি নয়—আমি যতদিন আছি, ততদিন ছেলেকে আগলে রাখব। কিন্তু আমার পরে সুমনের কী হবে? এই অনিশ্চয়তাই যেন তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে বড় কষ্ট।
সুমন হয়তো অন্যদের মতো হাঁটতে বা কথা বলতে পারে না, কিন্তু সেও একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, ভালোবাসা আছে এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
জরিনা বেগমের মতো অসহায় মায়েদের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমাদের সামান্য সহযোগিতাও কারও জীবনে বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
একটি খাবার, সামান্য সহযোগিতা কিংবা ভালোবাসার কয়েকটি কথা—হয়তো তাদের কঠিন জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। আল্লাহ সুমন ও তাঁর মাকে শক্তি, সুস্থতা ও স্বস্তি দান করুন এবং তাঁদের জীবনের কষ্ট সহজ করে দিন। আমিন।
-------------
এই সত্য ঘটনাটি ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে খাবার বিতরণের সময় জামালপুরের সুমনের সঙ্গে হওয়া সরাসরি কথোপকথনের ভিত্তিতে লেখা। গল্পটি লিখেছেন ফকরুদ্দিন বারী। ছবি ও ভিডিও দেখতে আমাদের Facebook ও YouTube চ্যানেল ভিজিট করুন।
Help Us Create More Stories of Hope
Your contribution funds programs like FAM Dignity Meal, helping meals and grocery support reach people in Bangladesh with dignity.